শনিবার, ১৫ মে, ২০২১

যক্ষ্মা বা টিবি রোগ প্রতিরোধের উপায় ! বিসিজি BCG টিকা নিলেও TB হয় কেন?

বিসিজি টিকার পুরা নাম ব্যাসিলাস ক্যালমেট গুয়েরিন Bacillus Calmette-Guérin (BCG). যক্ষ্মা বা টিবি (Tuberculosis TB) রোগ প্রতিরোধের কার্যকর উপায় এবং বিসিজি BCG টিকা নেয়ার পরও মানুষ টিবিতে আক্রান্ত হয় কেন এ সম্পর্কে বিস্তারিত থাকছে এ পর্বে। প্রিয় পাঠক, আমি ডাঃ দেলোয়ার জাহান ইমরান। যক্ষ্মা বা টিবি রোগ এবং এর পরবর্তী যাবতীয় শারীরিক ও মানুষিক জটিলতার চিকিৎসা দিয়ে আসছি। মাইকোব্যাক্টেরিয়াম টিউবারকিউলোসিস Mycobacterium Tuberculosis নামক জীবাণু এই রোগের কোসেটিভ এজেন্ট। জীবাণু শরীরে ঢুকলেই কিন্তু যক্ষ্মা অ্যাকটিভ হয়ে যায় না বরং কিছু ক্ষেত্রে ল্যানেন্ট বা সুপ্ত অবস্থায় থাকে আবার কিছু ক্ষেত্রে প্রি-ডোমিনেন্ট অবস্থায় থাকে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে গেলে অর্থাৎ যখন যাকে সুবিধা করতে পারে তার শরীরেই যক্ষ্মা সরাসরি আত্মপ্রকাশ করে থাকে যাকে আমরা অ্যাকটিভ টিবি বলে থাকি।
যক্ষ্মা বা টিবি রোগ প্রতিরোধের উপায়
বলতে গেলে আমাদের শরীরে এমন কোন অঙ্গ নাই, যেখানে যক্ষ্মা বা টিবি হয় না। যতগুলো যক্ষ্মা বা TB রয়েছে, এর মধ্যে ৮০ ভাগই ফুসফুসে হয়ে থাকে এবং এটি সবচেয়ে গুরুতর ও ভীষণ ছোঁয়াচে প্রকৃতির। শরীরের অন্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গের যক্ষ্মা এতোটা ছোঁয়াচে নয়। তাই সেগুলি ফুসফুসের যক্ষ্মার মতো ছড়ানোর ক্ষেত্রে ততটা ঝুঁকিপূর্ণ নয়। আগের পর্বগুলিতে আপনারা জেনেছেন-

বিসিজি BCG টিকা নিলেও টিবি TB বা যক্ষ্মা হয় কেন?

অনেকেই প্রশ্ন করেন বিসিজি টিকা নেয়ার পরও যক্ষা হয় কেন? আপনি ইতিমধ্যে জেনেছেন, আমাদের এমন কোন অঙ্গ নাই, যেখানে যক্ষ্মা হয়না তবে এর মধ্যে ৮০ ভাগই ফুসফুসে হয়ে থাকে যা সবচেয়ে গুরুতর ও ভীষণ ছোঁয়াচে প্রকৃতির। বিসিজি BCG টিকা ফুসফুসীয় টিবি প্রতিরোধ করতে পারে না। বিসিজি টিকার পুরা নাম ব্যাসিলাস ক্যালমেট গুয়েরিন Bacillus Calmette-Guérin (BCG), এ টিকা দেওয়া হয় শিশুর জন্মের সাথে সাথে অর্থাৎ ৪২ দিনের মধ্যে। বাংলাদেশ টিবি প্রধান দেশ হওয়ায় অনেক চিকিৎসকই আবার জন্মের দিনই শিশুদের এই টিকা দেয়ার পক্ষপাতী। 
কিন্তু এই বিসিজি BCG টিকা মূলত শিশু অবস্থায় অর্থাৎ শিশুদের টিউববারকুলাস মেনিনজাইটিস Tuberculous Meningitis এবং মিলিয়ারি টিবি Miliary Tuberculosis (TB) এবং কিছু বিচ্ছিন্ন সামান্য দেহাংশের টিবি প্রতিরোধের জন্য দেয়া হতে থাকে। Pulmonary TB অর্থাৎ ফুসফুসীয় যক্ষ্মা এই টিকা প্রতিরোধ করতে পারে না। তাছাড়া শিশুদের মধ্যে এটা প্রায় ২০% কে টিবি সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে এবং যারা সংক্রমিত হয়ে পড়ে তাদের মধ্যে এটি অর্ধেককে রোগে আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা করে। অর্থ্যাৎ এই টিকা শিশুদের মধ্যে মাত্র ২০% সংক্রমণ ঝুঁকি কমায় এবং ৮০% ঝুঁকিই থেকে যায়। অথচ নির্বাচিত হোমিওপ্যাথিক ঔষধ শিশু বা যুবক যেকারো শরীরের ভাইটাল ফোর্স উন্নত করে টিবি সংক্রমণ প্রতিরোধে ম্যাজিকের মত রেজাল্ট দিয়ে থাকে-যা অনেকেরই অজানা।
সুতরাং বুঝতেই পারছেন এই টিকা সব শিশুদেরও পুরুপুরি সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ। যার কারণে এই যুগেও সারা বিশ্বে টিবি বা যক্ষ্মা এখনও একটি আতঙ্কের নাম। বাংলাদেশের জেলা উপজেলা স্বাস্থকেদ্র বা এনজিও নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ কেদ্র গুলিতে খুঁজ নিলেই দেখবেন শিশুকালে বিসিজি BCG টিকা নিয়েছেন অথচ যক্ষ্মা বা টিবি রোগে আক্রান্ত হয়েছেন এমন রোগীদের সংখ্যাই বেশি। কারণ বাংলাদেশে শিশুদের বিসিজি টিকা দেয়া বাধ্যতামুলক। এরপরও টিবিতে আক্রান্ত হচ্ছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। 

তেমন কোন ভালো সুরক্ষা দিচ্ছে না এবং শিশু বয়সের পর যুবকদের ক্ষেত্রেও কোন কাজ দিচ্ছে না তারপরও এটি কেন ব্যবহৃত হচ্ছে ? এমন প্রশ্ন অনেকেরই মনে জাগতে পারে। উত্তর হচ্ছে "নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো" অর্থাৎ শিশু বয়সে কিছু কিছু শিশুদের ক্ষেত্রে তো কাজ দিচ্ছে তার উপর এর জন্য বিকল্প কোন কার্যকর ব্যবস্থা এলোপ্যাথি আজও আবিষ্কার করতে পারেনি। বিসিজি BCG টিকা টিবি প্রতিরোধে খুব বেশি কাজ করে না বিধায় আমেরিকার মতো দেশে এই টিকার তেমন কোন ব্যবহার নেই। 
The TB vaccine is called Bacillus Calmette-Guérin (BCG), and it is used in many countries to prevent severe forms of TB in children. However, BCG is not generally recommended in the United States because it has limited effectiveness for preventing the most common forms of TB and in preventing TB in adults.

যক্ষ্মা বা টিবি রোগ প্রতিরোধের উপায় কি ?

টিবিতে আক্রান্ত হলে বিনা খরচের সরকারি এলোপ্যাথিক চিকিৎসাই অধিকাংশ মানুষ গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু এর জটিলতা এবং পার্শপ্রতিক্রিয়া অনেক। বহু ক্ষেত্রেই রোগীদের জীবন প্রায় নরক যন্ত্রণায় ভরে দেয়। টিবির জটিলতা দূর হলেও বহু বর্ণনাতীত কষ্ট সারা জীবন ধরে বয়ে বেড়াতে হয়। যদিও হোমিওপ্যাথিতে রয়েছে টিবি রোগের এবং টিবি পরবর্তী যাবতীয় জটিলতার কার্যকর চিকিৎসা। তবে রোগটি শরীরে জেগে উঠার পূর্বে এর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করাই হলো বুদ্ধিমানের কাজ।

এর আগের পর্বে আপনারা জেনেছেন, টিবির জীবাণু শরীরে ঢুকলেই কিন্তু যক্ষ্মা বা টিবি অ্যাকটিভ হয়ে যায় না বরং কিছু ক্ষেত্রে ল্যানেন্ট বা সুপ্ত অবস্থায় থাকে আবার কিছু ক্ষেত্রে প্রি-ডোমিনেন্ট অবস্থায় থাকে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে গেলে অর্থাৎ যখন যাকে সুবিধা করতে পারে তার শরীরেই যক্ষ্মা সরাসরি আত্মপ্রকাশ করে থাকে যাকে আমরা অ্যাকটিভ টিবি বলে থাকি। তবে যারা ল্যানেন্ট বা সুপ্ত টিবিতে আক্রান্ত আছেন তাদের টিউবারকুলিন স্কিন টেস্ট Tuberculin Skin Test (TST)  করে সনাক্ত করা সম্ভব। প্রপার হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় সেটির চিকিৎসা করা হলে তা আর সহসাই জেগে উঠতে পারে না। কিন্তু কোন প্রকার চিকিৎসা না করলে ভাইটাল ফোর্সের দুর্বলতম অবস্থায় সেটি যেকোন সময় আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

বুঝতেই পারছেন ভাইটাল ফোর্সের দুর্বলতম অবস্থা সহজেই টিবি আক্রমণের পথ সুগম করে দেয়। যারা মাদক সেবন করেন তাদের ভাইটাল ফোর্স ক্রমাগত দুর্বল হতে থাকে। তাছাড়া মাদকসেবীরা এইডস এর উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন। আর যারা এইডসে আক্রান্ত হন HIV সংক্রমিত মানবদেহে সহজেই টিবি জেগে উঠে এবং বেশির ভাগ এইডসের রোগীরা টিবিতেই মারা যান। 

ডায়াবেটিস রোগীদের টিবি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার শুরুতেই যারা প্রোপার হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা নিয়ে এটি ঠিক না করেন বরং বিভিন্ন এলোপ্যাথিক বা রাসায়নিক ঔষধের মাধ্যমে সুগার নিয়ন্ত্রণের চিকিৎসা নিয়ে যাচ্ছেন আর ভেতরে ভেতরে রোগ জটিলতা বাড়িয়ে তুলছেন তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ভাইটাল ফোর্স ধীরে ধীরে দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে থাকে। সাধারণ মানুষের তুলোনায় এলোপ্যাথিক ঔষধ গ্রহণকারী ডায়াবেটিস রোগীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহু গুন কম থাকে। ভাইটাল ফোর্সের দুর্বলতম অবস্থায় ডায়াবেটিস রোগীদের শরীরে টিবি যেকোন সময় জেগে উঠতে পারে। 

এনিম্যাল ফুড বা প্রাণীজ খাবার, প্রক্রিয়াজাত খাবার, ফাস্টফুড জাংফুড পরিহার করে গার্ডেন গ্রীন ভেজিটেবল বা সবুজ শাকসবজি, পুষ্টিকর সুষম খাদ্য ও ফলমূল গ্রহণ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে থাকে। এতে করে টিবিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও কমে আসে। 

এমন কোন কাজ করা যাবে না যাতে শরীরে ভাইটাল ফোর্স দুর্বল হয়ে পড়ে। যাবতীয় মাদকদ্রব্য পরিহার করে চলা উচিত। এছাড়া যে যে কারণে ভাইটাল ফোর্স দুর্বল হয়ে পড়ে এ সম্পর্কে বিস্তারিত সবারই জেনে রাখা উচিত। কারণ যেকোন বয়সে ভাইটাল ফোর্স শক্তিশালী থাকাই হলো পুরিপূর্ণ সুস্বাস্থ বজায় থাকা। 

টিবির জীবাণুটি কিন্তু অ্যানেরোবিক (Anaerobic) প্রকৃতির অর্থ্যাৎ এরা কম বাতাসে বেঁচে থাকে। বেশি বাতাসে তাদের বংশ বিস্তারে অসুবিধা হয়। তাই ফুসফুসে তাজা বাতাস প্রবেশ করানোর জন্য নিয়মিত খেলাধুলা, হাঁটাচলা, ব্যায়াম ইত্যাদি বেশ ফলদায়ক। 
জনাকীর্ণ পরিবেশে বসবাস যথাসম্ভব পরিহার করে বাসস্থানের পরিবেশ খোলামেলা, আলো-বাতাসযুক্ত উষ্ণ প্রকৃতির হওয়া প্রয়োজন। কারণ টিবির জীবাণু আদ্র, স্যাঁতসেঁতে স্থানে বংশবিস্তার করতে পারে আরাম করে।

জীবনের শুরুতে যেসকল শিশুরা হোমিও চিকিৎসার তথ্যাবধানে চলে আসে তারা অন্যান্য শিশুদের তুলনায় উচ্চ জীবনী শক্তি নিয়ে বেড়ে উঠে। তাদের সহজেই টিবি প্রতিরোধী করে তুলা যায়। তবে যেসব শিশুরা হোমিও চিকিৎসার তথ্যাবধানে না আসে তাদের বিসিজি টিকা দেয়া দরকার কারণ সবাইকে সমান ফল না দিলেও ঐ বয়সে কিছু শিশু অন্তত টিবি প্রতিরোধী থাকবে।

নিজেকে টিবির সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পাবলিক প্লেস যেমনঃ রেল বাস লঞ্চ স্টেশন, বাজার ইত্যাদি স্থানে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে রুমাল ব্যবহার করা এবং মুখে মাস্ক ব্যবহার করা উচিত। মসজিদে অজু করার পর বা হোটেলে খাওয়ার পর সেখানা টাঙানো তোয়ালে বা গামছা ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন।

আপনি নিজে ফুসফুসীয় টিবিতে আক্রান্ত হলে অবশ্যই পাবলিক প্লেসগুলিতে মাস্ক ব্যবহার করুন। কারণ আপনার কারণে নিজের অজান্তেই বহু সুস্থ মানুষ টিবিতে আক্রান্ত হয়ে পড়বে। 

যদি আপনি হোমিও চিকিৎসা না নিয়ে বিনামূল্যে প্রদত্ত সরকারি চিকিৎসা গ্রহণ করে থাকেন তাহলে কোন ক্রমেই ঔষধের কোন ডোজ মিস দিবেন না। কর্তব্যরত চিকিৎসক যত মাস পর্যন্ত আপনাকে ঔষধ খেয়ে যেতে বলবেন আপনি ততদিন পর্যন্ত ঔষধ চালিয়ে যাবেন। 

এরপরও যদি আপনার টিবি না সাড়ে বা কফে রক্ত যায় অথবা অন্য কোন শারীরিক বা মানুষিক জটিলতা দেখা দেয় তাহলে মনে রাখবেন একমাত্র হোমিওপ্যাথিই আপনার জীবনের জন্য এক মহা আর্শীবাদ হয়ে আসবে। অর্থ্যাৎ প্রপার হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা নিলে এই সকল জটিলতা দূর হয়ে যাবে ইনশা-আল্লাহ। 
Dr Imran
ডাঃ দেলোয়ার জাহান ইমরান
ডিএইচএমএস (বিএইচএমসি এন্ড হসপিটাল), ডিএমএস; ঢাকা
রেজিস্টার্ড হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক (রেজিঃ নং-৩৩৪৪২)
যোগাযোগঃ আনোয়ার টাওয়ার, আল-আমিন রোড, কোনাপাড়া, ডেমরা, ঢাকা।
Phone: +88 01671-760874; 01977-602004 (শুধু এপয়েন্টমেন্টের জন্য)
About Me: Profile ➤ Facebook ➤ YouTube ➤