শুক্রবার, ২২ মে, ২০২০

ডাউন সিনড্রোম Down Syndrome টাইপ বা প্রকার কারণ লক্ষণ জটিলতা ও নিরাময়ের উপায়

আজকে আমরা ডাউন সিনড্রোম অর্থাৎ একটি জন্মগত ত্রুটি বা জেনেটিক ডিজঅর্ডার এর টাইপ বা প্রকার কারণ লক্ষণ জটিলতা ও নিরাময়ের উপায় সম্পর্কে জানবো। Down Syndrome কে সংক্ষেপে DS or DNS বলা হয়। যা ট্রাইসোমি ২১ নামেও পরিচিত। এটি মূলত শিশুদের  জন্ম পূর্বকালীন অর্থাৎ প্রি-ন্যাটাল পিরিয়ডের অন্যতম একটি দুরারোগ্য জেনেটিক সমস্যা যেখানে ২১ নং ক্রোমোজোমে আরেকটি অতিরিক্ত ক্রোমোজোম বিদ্যমান থাকে। যেহেতু মায়ের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত শিশু জন্ম নেয়ার ঝুঁকিও বাড়ে, তাই চিকিৎসা বিজ্ঞানে অধিক বয়সে, বিশেষ করে পঁয়ত্রিশোর্ধ্ব বয়সে গর্ভধারণ করাকে নিরুৎসাহিত করা হয়। এরকম সন্তান জন্মদানের সম্ভাবনা ২০ বছর বয়সী মায়েদের ক্ষেত্রে ০.১% এরও কম এবং ৪৫ বছর বয়সী মায়েদের ক্ষেত্রে তা ৩% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।

ডাউন সিনড্রোম নিয়ে জন্ম নেয়া মানুষের ক্রোমোজোমের গঠন সাধারণ মানুষের ক্রোমোজমের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন হয়ে থাকে। ব্রিটিশ চিকিৎসক জন ল্যাংডন ডাউন সর্বপ্রথম ১৮৬৬ সালে এ সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদেরকে চিহ্নিত করেন বলে তার নামানুসারে একে ডাউন সিনড্রোম নামকরণ করা হয়।
ডাউন সিনড্রোম জন্মগত ত্রুটি বা জেনেটিক ডিজঅর্ডার
আপনারা হয়তো জানেন, মানবদেহের গঠনের একককে কোষ বা সেল বলা হয়ে থাকে। আর মানুষের বংশগতি, আচার আচরণ ইত্যাদি সবকিছু নির্ধারিত হয় কোষস্থ DNA এর মাধ্যমে। এ কারণে ডিএনএ-কে বলা হয় আমাদের বংশগতির ধারক ও বাহক। অর্থাৎ আমাদের শারীরিক ও মানসিক যাবতীয় বৈশিষ্ট্য, আচার-আচরণ, বুদ্ধিমত্তা, চেহারা, উচ্চতা, গায়ের রং সব বৈশিষ্ট্যই ডিএনএ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। অন্যদিকে মানব শরীরে ডিএনএ এর অসামঞ্জস্য দেখা দিলে নানারকম শারীরিক ও মানসিক ত্রুটি দেখা দেয়, যাদের আমরা সাধারণভাবে জন্মগত ত্রুটি বা জেনেটিক ডিজঅর্ডার বলে থাকি। ডাউন সিনড্রোম হলো সেরকমই একটি জেনেটিক ডিজঅর্ডার।

ডাউন সিনড্রোম - কিভাবে হয় 

কোষে অবস্থান করা কোটি কোটি ডিএনএ এর সমন্বয়ে একেকটি ক্রোমোজম তৈরি হয়। মানবদেহের প্রতিটি কোষের মধ্যে ২৩ জোড়া ক্রোমোজম নামের অঙ্গানু থাকে, যার অর্ধেক আসে শিশুর মায়ের কাছ থেকে আর বাকি অর্ধেক বাবার কাছ থেকে। ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত মানুষের শরীরের প্রতিটি কোষে ২১ নম্বর ক্রোমোজমটির সঙ্গে আংশিক বা পূর্ণভাবে আরেকটি ক্রোমোজম (ট্রাইসোমি ২১) যুক্ত থাকে। আক্রান্ত শিশুর পিতামাতা জেনেটিক ভাবে স্বাভাবিক থাকে। অতিরিক্ত ক্রোমোজোমের ঘটনা দৈবক্রমে ঘটে থাকে।
২১ নম্বর ক্রোমোজম তিনটি থাকে বলে ২১/৩ বা একুশে মার্চ বিশ্ব ডাউন সিনড্রোম দিবস হিসেবে পালিত হয়। 
মূলত এই অতিরিক্ত ক্রোমোজমের কারণেই ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত শিশুদের বিশেষ কিছু শারীরিক ও মানসিক ত্রুটি লক্ষ্য করা যায়। চেহারার গঠনগত দিক বিবেচনায় বা আচার আচরণে অধিকাংশ ডাউন সিনড্রোম আক্রান্তদের মাঝে মিল থাকার কারণে তাদেরকে সহজেই ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত শিশু হিসেবে শনাক্ত করা যায়।

ডাউন সিনড্রোম - টাইপ বা প্রকার

  • ট্রাইসোমি ২১ (Trisomy 21) : এটা ডাউন সিনড্রোমের সব থেকে প্রচলিত ধরণ এবং ৯৫% ক্ষেত্রেই এটি দেখা যায়। যেখানে প্রতিটি কোষে ২১ নং ক্রোমোজোমে আরেকটি অতিরিক্ত ক্রোমোজোম বিদ্যমান থাকে।
  • মোসাইসিসম (Mosaicism) :  এটি মাত্র ১% ক্ষেত্রে দেখা যায়। এক্ষেত্রে সব কোষে না হলেও কয়েকটা কোষে অতিরিক্ত ক্রোমোজোম থাকে। ট্রাইসোমির কয়েকটা উপসর্গ এখানেও দেখা যায়।
  • ট্রান্সলোকেশান (Translocation) :  মূলত ৪% ক্ষেত্রে এটি দেখা যায়। এই ধরণের ডাউন সিনড্রোমে, শুধুমাত্র ২১ নং ক্রোমোজোমের অতিরিক্ত অংশ থাকে অর্থাৎ সর্বমোট ৪৬ টা ক্রোমোজোম থাকলেও এর মধ্যে একটার সাথে ক্রোমোজোম ২১ এর অতিরিক্ত অংশ যুক্ত থাকে।

ডাউন সিনড্রোম - কি কারণে হয় 

ইতিমধ্যে জেনেছেন ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত মানুষের শরীরের প্রতিটি কোষে ২১ নম্বর ক্রোমোজমটির সঙ্গে আংশিক বা পূর্ণভাবে আরেকটি ক্রোমোজম (ট্রাইসোমি ২১) যুক্ত থাকে। কিন্তু সমস্যা হলো, ২১তম ক্রমোজমের অসংগতির ফলে ডাউন সিনড্রোম দেখা দেয়, এটা জানা গেলেও ঠিক কোন কোন কারণে এ অসংগতি হতে পারে, এ সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা আজো নিশ্চিত হতে পারেননি। আর তাই এলোপ্যাথিক সিস্টেমে এর কোন সমাধান নেই।
ডাউন সিনড্রোম মূলত একটি জেনেটিক ডিসঅর্ডার। এই সকল জেনেটিক সমস্যা নিয়ে বহু আগে থেকেই হোমিওপ্যাথি কাজ করে আসছে এবং হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার রয়েছে নির্দিষ্ট নিয়মনীতি বা সংবিধান যা বিশ্বের আর কোন চিকিৎসা শাস্ত্রের নেই। যেকোন দুরারোগ্য রোগের একটি উন্নত আর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন চিকিৎসা মানেই হোমিওপ্যাথি। শিশুদের এইসকল  জন্মগত ত্রুটি বা জেনেটিক ডিসঅর্ডার হওয়ার মুলে বিশেষ করে ডাউন সিনড্রোম এর ক্ষেত্রে যে ফ্যাক্টর বেশি কাজ করে তা হলো PRS - Post Rabies Syndrome এছাড়া  PTS অথবা Infectious Miasms - Sycosis & Syphilis Miasm And Tubercular Diathesis ...(Read More) ও এর পেছনে থাকতে পারে, যেগুলি মূলত অভিজ্ঞ হোমিও চিকিৎসকগণ কেইস টেকিং করার সময় উৎঘাটন করে রোগীর সুচিকিৎসা নিশ্চিত করে থাকেন। মনে রাখবেন, রিয়েল হোমিওপ্যাথি বর্তমান বিশ্বে শিশুদের জন্মগত ত্রুটি বা জেনেটিক ডিজঅর্ডার সংক্রান্ত সমস্যাগুলির একটি কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি।

ডাউন সিনড্রোম - প্রকট বৈশিষ্ট্য

  • মাংসপেশির শিথিলতা
  • আকারে ছোট মাথাসহ কম উচ্চতা
  • চোখের কোনা উপরের দিকে উঠানো বা ট্যারা দৃষ্টি
  • চ্যাপ্টা নাক
  • আকারে ছোট কান ও ঘাড়
  • হাতের তালুতে একটি মাত্র রেখা
  • জিহ্বা বের হয়ে থাকা 
  • অনিয়ন্ত্রিতভাবে লালা ক্ষরণ ইত্যাদি

ডাউন সিনড্রোম - অন্যান্য শারীরিক ও মানসিক লক্ষণ বা জটিলতা

  • তাদের মাংসপেশী সাধারণ মানুষদের তুলনায় শিথিল হয়। অর্থাৎ সাধারণ একজন মানুষের পেশীতে যতটা শক্তি থাকে তা ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তির থাকে না।
  • অনেকের ক্ষেত্রে আবার বিপরীতটাও লক্ষ্য করা যায়। স্বাভাবিকের তুলনায় অতিরিক্ত শক্ত মাংসপেশী থাকে অনেকের যা তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রমের জন্যে বাধার সৃষ্টি করে। 
  • কানে কম শোনা, কথা বলতে দেরি হওয়া, কম বুদ্ধি ইত্যাদি জটিলতা থাকে। 
  • কিছু ক্ষেত্রে আক্রান্তদের অল্প বয়সেই হৃদরোগের সমস্যা হয় আর কিছু ক্ষেত্রে বয়স বাড়লে হার্টের সমস্যা গুরুতর হয়ে ওঠে, কেউ কেউ পাকস্থলীর সমস্যায়ও আক্রান্ত হয়ে থাকে। 
  • কারো ক্ষেত্রে থাইরয়েডের ত্রুটি দেখা যায়। 
  • হার্টের ত্রুটি এবং থাইরয়েডের ত্রুটি থাকার কারণে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে।
  • টেস্টিকুলার ক্যান্সার ও লিউকোমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।
  • তাদের আইকিউ বা বুদ্ধিমত্তা অনেক কম হয় তবে ৩০ বছর বয়সের পর সমস্যা আরো বেড়ে যায়। 
  • অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্তরা কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলে। 
ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত একটি শিশু বয়সের সাথে সাথে আর দশজন স্বাভাবিক শিশুর মতো বুদ্ধিবৃত্তিক বা আচরণগত বিকাশ ঘটাতে পারে না। তাদের আবেগীয় বিকাশটি সঠিকভাবে হয়ে ওঠে না। ফলে আশেপাশের যেকোন কিছুর প্রতি তাদের অতিরিক্ত আবেগ প্রদর্শন বা একদমই আবেগীয় কোনো অনুভূতি দেখা যায় না। দেখা গেলো, খুব সাধারণ একটি শব্দে তারা ভয় পেয়ে চমকে ওঠে, কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। আবার অনেক সময় এরাই অনেক ভয়ের বিষয় বা অনুভূতি প্রকাশ করার মতো ঘটনাকে অগ্রাহ্য করে। অর্থাৎ, মানসিক বিকাশ বা জ্ঞানীয় বিকাশগত জায়গা থেকে ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্তদের বেশ কিছু সমস্যা দেখা যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত গুটিকয়েক শিশু অস্বাভাবিক আইকিউ সম্পন্ন হয়ে থাকে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এদের Exceptional Children বলা হয়।

ডাউন সিনড্রোম - নিরাময়ের উপায়

বর্তমান বিশ্বে এই সমস্যার একটি কার্যকর চিকিৎসা হল রিয়েল হোমিওপ্যাথি। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা শাস্ত্র শিশুদের জীনগত ত্রুটি বা জন্মগত রোগের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করে থাকে। কারণ জেনেটিক ডিসঅর্ডার হওয়ার মুলে যে ফ্যাক্টর কাজ করে তা হলো PRS - Post Rabies Syndrome এছাড়াও Infectious Miasms - Sycosis & Syphilis Miasm And Tubercular Diathesis ও এর পেছনে থাকতে পারে। আর এই সকল সমস্যা সমাধানের কার্যকর উপায় রয়েছে হোমিওপ্যাথিক ট্রিটমেন্ট সিস্টেমে। তবে এর জন্য যথা সময়ে সমস্যাটি চিহ্নিত করে রিয়েল হোমিওপ্যাথিক থেরাপিউটিক সিস্টেমে দক্ষ একজন হোমিও চিকিৎসকের পরামর্শ এবং ট্রিটমেন্ট নিলে আশানুরূপ ফলাফল পেতে পারেন।
Dr Imran
ডাঃ দেলোয়ার জাহান ইমরান
ডিএইচএমএস, ডিএমএস, বিএসসি এন্ড এমএসসি; ঢাকা
রেজিস্টার্ড হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক (রেজিঃ নং-৩৩৪৪২)
যোগাযোগঃ আনোয়ার টাওয়ার, আল-আমিন রোড, কোনাপাড়া, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা।
ফোন : ০১৬৭১-৭৬০৮৭৪ এবং ০১৯৭৭-৬০২০০৪
প্রোফাইল ➤ ফেইসবুক ➤ ইউটিউব ➤