শনিবার, ১৬ মে, ২০২০

সেরিব্রাল পালসি - শিশুর স্নায়বিক ভারসাম্যহীনতার কারণ লক্ষণ ও উন্নত চিকিৎসা

শিশুর জন্মগত ত্রুটি সেরিব্রাল পালসি Cerebral Palsy  সম্পর্কে আজ আলোকপাত করবো। Cerebral মানে মস্তিষ্ক আর Palsy মানে অবশভাব অর্থাৎ "মস্তিষ্কের অবশভাব" বা "মস্তিষ্কের অবশ হয়ে পড়া" যা মূলত একধরনের স্নায়বিক ভারসাম্যহীনতা। এক্ষেত্রে শিশুর স্নায়বিক ভারসাম্যহীনতার পেছনে মস্তিষ্ক গঠনের সময় আঘাতজনিত কারণ দায়ী থাকে যাকে বলা হয় Post Trauma Syndrome(PTS). এছাড়া স্নায়ুকোষের ঠিকঠাক ভাবে কাজ না করার মতো কারণও পাওয়া যায় যার পেছনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দায়ী Post Rabies Syndrome(PRS).  চিকিৎসা দেয়ার সময় আমরা মূলত এই বিষয়গুলিই বেশি দেখে থাকি।

বিভিন্ন দুরারোগ্য রোগের জেনেটিক মেটেরিয়ালের প্রকটতাও এই ধরণের সমস্যার জন্য দায়ী যা একমাত্র হোমিও চিকিৎসার মাধ্যমে প্রচ্ছন্ন করা যায়। শিশুর জন্মগত ত্রুটি এবং জন্মের পর মারাত্মক রোগ ব্যাধিগুলির প্রকৃত কারণ ও সমাধান সংক্রান্ত আর্টিকেলটি দেখে নিবেন কারণ সেরিব্রাল পালসি তেমনই একটি সমস্যা। সেরিব্রাল পালসির জন্য শিশুর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের নড়াচড়া, পেশীর সক্ষমতা, ভারসাম্য, সব কিছুই ব্যাহত হয়। এটি হল শিশুদের একটি দুরারোগ্য অক্ষমতা। তবে এর উন্নত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা রয়েছে।

সেরিব্রাল পালসি জন্মের সময় পাওয়া আঘাতে বা জন্মগত ত্রুটি অর্থাৎ (PTS and PRS) এর জন্য হতে পারে। এছাড়া প্রসবকালীন জটিলতার জন্য নবজাতকের মস্তিষ্কে যদি অক্সিজেনের অভাব ঘটে তাহলে শিশুটির মস্তিষ্কের ক্ষতি হতে পারে। শিশুর জন্মগত ত্রুটি গর্ভাবস্থায় মায়ের সংক্রামক রোগ বা জিনগত বিকৃতির জন্য হয়ে থাকে। জন্মগত সেরিব্রাল পালসি জন্মের আগে বা জন্মের সময় হওয়া মস্তিষ্কের ক্ষতির জন্য হয়ে থাকে।
সেরিব্রাল পালসি - স্নায়বিক ভারসাম্যহীন শিশুর উন্নত চিকিৎসা
যেহেতু সেরিব্রাল পলসি হচ্ছে শিশুর জন্মের সময়, আগে অথবা জন্মের কিছু পরে ব্রেইন এর কোন আঘাত বা রক্ত চলাচলের ব্যঘাতের ফলে সৃষ্ট শারীরিক চলাচলের এবং এর সমন্বয়ের সমস্যা তাই সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৫০% শিশুরা বুদ্ধিগত প্রতিবন্ধকতার শিকার। তবে কিছু শিশু সাধারণের চেয়ে অনেক গুণ বেশি বুদ্ধি সম্পন্ন হয়ে থাকে। সেরিব্রাল পালসি শারীরিক প্রতিবন্ধীতার মতই। অটিজমে মানসিক সমস্যা তৈরি হয়। সেরিব্রাল পালসিতে মস্তিষ্কে সমস্যা হতেও পারে, আবার নাও হতে পারে।
জন্মগত ত্রুটি নিয়ে কোন বাচ্চা কোন পরিবারে জন্মগ্রহণ করুক তা কারোই কাম্য নয়। আর যদি কোন পরিবারে এমন বাচ্চা জন্ম হয় বা পরে সেরিব্রাল পালসির মতো সমস্যায় আক্রান্ত হয় তবে তাকে বোঝা মনে না করে সুস্থ করে তুলতে হবে। শিশুটির বর্তমান ত্রুটি, তার পিতা-মাতা, দাদা-দাদী, নানা-নানী অর্থাৎ ফ্যামিলি হিস্ট্রি নিয়ে একটি প্রপার হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা মাধ্যমের সেরিব্রাল পালসির মতো সমস্যার বিভিন্ন পর্যায়ে আশানুরূপ ফলাফল পাওয়া যায়।

সেরিব্রাল পালসি - টাইপ

মস্তিষ্কের কোন অংশটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করে সেরিব্রাল পালসিকে চারটি শ্রেণীতে বিন্যস্ত করা যায়। এগুলো হলো:
  • Spastic Cerebral Palsy
  • Athetoid Cerebral Palsy
  • Ataxic Cerebral Palsy
  • Mixed Cerebral Palsy
স্প্যাস্টিক সেরিব্রাল পালসি: সেরিব্রাল পালসির প্রকরণগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে সাধারণ (প্রায় ৯১ শতাংশ)। সেরিব্রাল কর্টেক্সে আঘাতের ফলে এটি দেখা দেয়। আক্রান্ত শিশুর মাংসপেশি শক্ত এবং মাংসপেশীতে টানটান ভাব অনেক বেশি থাকে। জয়েন্টের নড়াচড়া অনেক শক্ত হয়ে যায়। 

অ্যাথিটয়েড সেরিব্রাল পালসি: এতে আক্রান্ত শিশুর মাংসপেশি খুব দ্রুত শক্ত হয়ে ওঠে, হাতে-পায়ে অনিয়ন্ত্রিত ঝাঁকুনি দেয়। জিহ্বা ও কণ্ঠনালি নিয়ন্ত্রণ করতে সমস্যা হওয়ায় এদের কথা বলতে অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়।

আটাক্সিক সেরিব্রাল পালসি: এটি সবচেয়ে বিরল প্রজাতির সেরিব্রাল পালসি। সাধারণত ব্রেইনের সেরিবেলাম অংশে দুর্বিলতা থাকে অথবা সেরেবেলামে আঘাতের ফলে এটি দেখা দেয়। এ ধরনের শিশুরা নিজে থেকে কিছু করতে গেলে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ভেতর সমন্বয় করতে পারে না এবং ভারসাম্যেও সমস্যা থাকে। মাথা, ঘাড় ও কেমড় স্থির রাখতে পারে না। 

মিক্সড সেরিব্রাল পালসি: এ ধরনের শিশুদের লক্ষণসমূহ বিভিন্ন প্রকার সেরিব্রাল পালসির সমন্বয়ে হয়ে থাকে। যদিও স্প্যাস্টিক ও অ্যাথিটয়েড এই দুই প্রকারের সমন্বয়ই বেশি দেখা যায়।

সেরিব্রাল পালসি - কারণ

ঠিক কী কারণে শিশুদের মধ্যে সেরিব্রাল পালসি দেখা দেয়, তা এখন পর্যন্ত অজানা তবে গর্ভাবস্থায় বা জন্মের সময় বা জন্মের প্রথম তিন বছরের মধ্যে মস্তিষ্কের আঘাত বা ক্ষতকেই এর মূল কারণ হিসেবে ধরা হয় যাকে বলা হয়ে থাকে Post Trauma Syndrome(PTS). প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রেই গর্ভাবস্থায় মস্তিষ্কের আঘাত শিশুকে সেরিব্রাল পালসির দিকে ঠেলে দেয়।
  • শিশুর জন্মগত ত্রুটি গর্ভাবস্থায় মায়ের সংক্রামক রোগ বা জিনগত বিকৃতির জন্য হয়ে থাকে
  • জন্মগত সেরিব্রাল পালসি জন্মের আগে বা জন্মের সময় হওয়া মস্তিষ্কের ক্ষতির জন্য হয়ে থাকে
  • গর্ভাবস্থায় প্রসূতির বিভিন্ন অসুস্থতা থাকলে। যেমন: হাম, অনিয়ন্ত্রিত বহুমূত্র, উচ্চ রক্তচাপ, ভাইরাস জ্বর ইত্যাদি
  • গর্ভাবস্থায় প্রসূতি অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ সেবন করলে কিংবা প্রয়োজনীয় ফলিক অ্যাসিড এর অভাব হলে
  • অপরিণত অবস্থায় শিশু ভূমিষ্ট হলে
  • প্রসবের সময় মস্তিষ্কে আঘাত পেলে
  • জন্মের পর শিশুটি স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে না পারলে
  • শিশুটি তীব্র জন্ডিসে আক্রান্ত হলে
  • জন্মের পর মস্তিষ্কের সংক্রমণজনিত ব্যধিতে আক্রান্ত হলে। যেমন: মেনিনজাইটিস
  • কোনো দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত পেলে
  • কোনো রোগ বা সংক্রমণের কারণে (জ্বর বা ডায়রিয়ায়) শরীর পানিশূন্য হয়ে পড়লে
  • রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ের ফলেও (যেমন চাচাতো, ফুফাতো, মামাতো, খালাতো বোন-ভাইয়ের মধ্যে বিয়ে) তাদের বাচ্চা সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়
  • এছাড়াও বাবা এবং মায়ের রক্তের গ্রুপ একই হলে অনাগত শিশুর সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি  হতে পারে
মূলত এই সকল কারণগুলি আমরা উপরি উপরি চিন্তা করে নির্ণয় করে থাকি। প্রকৃত পক্ষে এই সমস্যার পেছনের বাস্তব কারণ হলো Post Rabies Syndrome(PRS) and Post Trauma Syndrome(PTS) এবং বংশগত ভাবে প্রাপ্ত বিভিন্ন দুরারোগ্য রোগের জেনেটিক মেটেরিয়ালস।

সেরিব্রাল পালসি - লক্ষণ

সাধারণত শিশু জন্মের প্রথম তিন বছরের মধ্যেই সেরিব্রাল পালসির লক্ষণগুলো স্পষ্ট হতে শুরু করে। এটি শরীরের যেকোন অঙ্গকে আক্রমণ করতে পারে। মস্তিষ্কের আঘাত বা ট্রমার প্রকৃতি ও মাত্রার ওপর রোগটির তীব্রতা নির্ভর করে। তাই এর উপসর্গগুলো একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। তবে যেগুলি আমরা বেশি দেখি সেগুলির মধ্যে রয়েছে -
  • আক্রান্ত শিশুদের দেহের ভারসাম্য বজায় রাখতে অসুবিধা যা শিশুর বসা, দাঁড়ানো, হাঁটার শিখার সময় স্পষ্ট হয়ে ওঠে
  • আক্রান্ত শিশুর পেশীর গঠন অধিক শক্ত বা শিথিল হতে দেখা যায়। এর জন্য আক্রান্ত শিশুদের হাত পা কুঁকড়ে যায়, অনিয়মিত পেশীর সঙ্কোচন ঘটে এবং ক্রমাগত কাঁপতে থাকে। এর ফলে কারো সাহায্য ছাড়া হাঁটাচলা, বসে থাকা বা দাঁড়ানো কোনোটাই সম্ভব হয় না
  • হামাগুড়ি দেওয়ার সময় একদিকে হেলে থাকা, ছয় মাস বয়সে পেরিয়ে যাবার পরেও বসতে না শেখা, অথবা ১২-১৮ মাসের পরেও হাঁটতে না পারা, এগুলো সেরিব্রাল পালসির লক্ষণ হতে পারে
  • কেউ কেউ লেখা, দাঁত মাজা বা জুতো পরা, এগুলো করতে পারে না
  • কারো ক্ষেত্রে শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ, কথা বলা ও খাদ্য চর্বনে তাদের অসুবিধা দেখা দেয়
যদিও সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত শিশুরা অনেক সময়ই স্পষ্ট ভাবে কথা বলতে পারে না, কিন্তু তারা অন্যদের বলা কথা বা দেওয়া নির্দেশ সঠিক ভাবে বুঝতে এবং অনুসরণ করতে পারে। সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত বেশীরভাগ শিশু অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত হয়। ভিন্নতাও কিছুটা আছেই, কারন এ রোগের উৎপত্তির একটা মূল কারণ জন্মের সময় কিংবা পরে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলে ব্যাঘাত হওয়া।

সেরিব্রাল পালসি - চিকিৎসা 

ট্র্যাডিশনাল ট্রিটমেন্ট: মূলত সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসায় ফিজিওথেরাপিস্ট, স্পীচ ও ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট, পেডিয়াট্রিসিয়ান, অক্যুপেশনাল থেরাপিস্ট, বিশেষ ধরনের শিক্ষক এবং মানসিক চিকিৎসক সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন পড়ে ট্র্যাডিশনাল চিকিৎসা ব্যবস্থায় যা অনেক ক্ষেত্রেই ব্যায়বহুল এবং সাধারণের সাধ্যের বাহিরে।

হোমিওপ্যাথিক ট্রিটমেন্ট: শিশুদের সেরিব্রাল পালসি সমস্যার একটি উন্নত এবং নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা পদ্ধতি হলো হোমিওপ্যাথি। প্রপার একটি হোমিও চিকিৎসায় এই ধরণের শিশুদের স্থায়ী পরিবর্তন নিয়ে আসা যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। তবে এর জন্য অভিজ্ঞ একজন হোমিও চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে চিকিৎসা নেয়া জরুরী অন্যথায় ভাল ফলাফল আশা করা দুস্কর। এক্ষেত্রে হোমিও চিকিৎসকগণ শুধুমাত্র উপরি উপরি দিক চিন্তা করেই চিকিৎসা প্রদান করেনা না কারণ এর পেছনে থাকে PTS, PRS এবং পিতা-মাতা বা পূর্ব পুরুষ থেকে প্রাপ্ত দুরারোগ্য রোগের জেনেটিক মেটিরিয়াল। তাই এই ক্ষেত্রে শিশুর বর্তমান অবস্থা, পিতা-মাতা, দাদা-দাদী অর্থাৎ ফ্যামিলি হিস্ট্রি জেনে তার জেনেটিক্যাল অবস্থা বিচার বিশ্লেষণ পূর্বক চিকিৎসা শুরু করতে হয়। তখন নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে এবং হোমিওপ্যাথির নিয়মনীতি অনুসরণ করে একটি উন্নত চিকিৎসা দিলে শিশু দিন দিন উন্নতির দিকে যেতে থাকে এবং এক সময় সার্বিক একটি স্থায়ী পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় যা হোমিওপ্যাথি ছাড়া অন্যকোন চিকিৎসা শাস্ত্রে সম্ভব হয় না।
Dr Imran
ডাঃ দেলোয়ার জাহান ইমরান
ডিএইচএমএস, ডিএমএস, বিএসসি এন্ড এমএসসি; ঢাকা
রেজিস্টার্ড হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক (রেজিঃ নং-৩৩৪৪২)
যোগাযোগঃ আনোয়ার টাওয়ার, আল-আমিন রোড, কোনাপাড়া, যাত্রাবাড়ী-ডেমরা রোড, ঢাকা।
Phone: +88 01671-760874; 01977-602004 || E-mail : delowaridb@gmail.com
About Me: Profile ➤ Facebook ➤ YouTube ➤